এডিনবরা সরস্বতী পুজো
আমি যখন প্রথম এই শহরে পা রাখি তখন একটি বাঙালিকেও চিনতাম না। আমার সঙ্গিনী তখন ছিল স্টকহোমে। একা একা নতুন শহরে খুব সহজে বাঙালি খুঁজে পেলাম না। গেলাম হিন্দু মন্দির; সেখানে ঠিক সুবিধে করতে পারলাম না (আমার হিন্দি যে শুনেছে সে জানে)। প্রথম বাঙালি দের দেখা মিলল ইন্ডিয়ান ফিল্ম স্ক্রিনিং এ। সেখান থেকেই পরিকল্পনা শুরু হল শহরের সব বাঙ্গালিদের পাকড়াও করে একটা ফেসবুক পেজ খুলতে হবে। তারপর মাঝে মাঝে কোথাও ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে; আড্ডা, পিকনিক করা যাবে। ২০১৬ তেই প্রথম ভাবি সরস্বতী পুজো করার কথা। কিন্তু বেশি লোকজন জোগাড় করতে না পেরে ফিরে গেলাম সঙ্গিনীর কাছে সুইডেনে। ২০১৬ তে দুর্গা পুজো তে গিয়ে দেখলাম এই শহরে অনেক বাঙালি। অনেকের সাথে পরিচয় হল (যেহেতু বউ আছে সঙ্গে; তাই আমি নিরাপদ)। পুজা বার্ষিকী বের করতে গিয়ে আলাপ হল একাধিক কচি কাচার সাথে। ২০১৭ এর দুর্গা পুজো তে পরিচয় হল আরো অনেক বাঙালি এর সাথে। মনে হল তাহলে ২০১৮ টা একটা সরস্বতী পুজো দিয়ে শুরু করি।
এডিনবরা তে মন্দিরে সরস্বতী পুজো হয় খুব সুন্দর করে। আমার কোনদিন সেটা দেখার সুযোগ হয় নি। আর অনেকেই বাড়িতে সরস্বতী পুজো করে। আমি আর এই পুজোর পুরোহিত একদিন ভাবলাম যদি সবাই মিলে সেই পাড়ার পুজোর মত চাঁদা তুলে একটা পুজো করা যায়; পুরো বাঙালি স্টাইল এ। আমাদের তিন বন্ধু পরিবারের কাছে প্রস্তাব টা রাখি। আমরা এই চারটে পরিবার তখন জানতাম না কতজন আগ্রহী হবে এই পুজো তে। তারপর দেখা গেল যাকেই বলি সেই খুব উৎসাহী। তাই ঘরোয়া স্টাইল এর বাঙালি পুজো টা চারটে পরিবার ছাপিয়ে গোটা শহরের অনেক বাঙালি দের একত্রিত করল। পুজোর পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি শুরু হল অনেক আগে থেকে। ওয়েলস পুজো কমিটি আমাদের প্রতিমা দান করবেন বললেন। এটা আমাদের উৎসাহ দ্বিগুন বারিয়ে দিল।
আমাদের এই এডিনবরা সরস্বতী পুজো হবে গিলমারটন সোসাইটি হল এ, ফেব্রুয়ারী ৩। এই পুজো তে আমাদের কতো খরচ হবে খুব বেশি না ভাবেই সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পরেছি। অনেকেই প্রচুর বেশি অনুদান করেছে। স্বেছায় অনেকেই পুজোর ভোগ, ফুল, পায়েস ইত্যাদি সামগ্রি নিয়ে আসবে এই পুজো তে। পুজো উপলক্ষে থাকবে বসে আঁক, কুইজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মাটির ভাঁড়ে চা, ঝাল মুড়ি, আর নির্ভেজাল আড্ডা।
উৎসব আমাদের একত্রিত করে। কেউ আসে পুজোর ভক্তিতে, কেউ আসে খাবার লোভে, আবার কেউ আসে গান গাইতে, কবিতা বলতে বা শুধুই আড্ডা দিতে। বাঙালিরা উৎসব মুখর এবং অতিথিপরায়ণ। তাই আমাদের পুজো খুব ভালো কাটবে এই আশা রাখি। এই পুজোতে কারা উদ্যোগ নিল সেটা বড় ব্যাপার নয়, পরের বছরেও যাতেও এই উৎসাহ, উদ্যোগ নিয়ে মিলে মিশে সরস্বতী পুজো টা আরো ভালো ভাবে করতে পারি সেটার দিকে চেষ্টা রাখতে হবে সবাই কে। এই শহরেই একদিন হেঁটে বেড়াতেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, কাদম্বিনি গাঙ্গুলি, অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় এর মত দিকপাল রা। আমরা সরস্বতী পুজোর মধ্যে দিয়ে ওদের স্মরণ করব। আর সবাই একে অন্য কে উৎসাহ দিয়ে এগিয়ে যাব। এডিনবরা তে প্রতি বছর নতুন নতুন বাঙালি আসবে, আবার চলে যাবে। আমরা এই সরস্বতী পুজো এর মধ্যে খুঁজে পাব কিছু নতুন মুখ, নতুন প্রতিভা। সবাই ফিরে পাব আমাদের ছোটবেলা। আর প্রেমিক প্রেমিকা সন্ধানিরা সরস্বতী পুজো তে খুঁজে পাবে তাদের মনের মানুষ কে। যেভাবে হয়ত কোন এক কালে আমি পেয়েছিলাম আমার সঙ্গিনী টি কে। আর আজ ও সেই পুরনো প্রেম ফিরে পেতে চেষ্টা করব যদি সে সেই হলুদ শাড়ি টা এবার পরে। আমার বুকে ত জোরা ঢাকের শব্দ শুরু হয়ে গেছে; তোমাদের?

Comments
Post a Comment